জাতীয় ডেস্ক | রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | 2 বার পঠিত

রাজধানীতে সম্প্রতি চালু হওয়া এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় মামলা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণার ঘটনা সামনে এসেছে। যানবাহনের মালিকদের মোবাইলে বিদেশি নম্বর থেকে পাঠানো হচ্ছে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ভুয়া এসএমএস। সেখানে জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি লিংক যুক্ত করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীকে নিয়ে যাচ্ছে বিআরটিএর আদলে তৈরি একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি মূলত ব্যাংক কার্ডের তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ফিশিং চক্র।
রোববার প্রকাশিত ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একটি এসএমএসের মাধ্যমে। মেসেজে প্রেরক হিসেবে কোনো সরকারি সংস্থা বা বিআরটিএর নাম নেই। বরং ব্যবহার করা হয়েছে +৬৩ কোডযুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নম্বর— +63 948 331 8282, যা ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোড।
চলতি বছরের ৭ মে ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে যানবাহনের মালিককে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতারক চক্র মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তারা এমন এসএমএস পেয়েছেন যেখানে দাবি করা হয়েছে এআই ক্যামেরায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এক মোটরসাইকেল চালক ও কনটেন্ট নির্মাতা ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করে বিষয়টি সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, এসএমএসে যে তারিখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন তার মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চট্টগ্রামে ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গাড়ি না চালানো সত্ত্বেও কীভাবে তার নামে মামলা হতে পারে এবং কেন একটি বিদেশি নম্বর থেকে সরকারি নোটিশ পাঠানো হবে?
ফ্যাক্টওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান একই ধরনের এসএমএস পাওয়ার কথা সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, বিদেশি নম্বর থেকে ওভারস্পিড সংক্রান্ত জরিমানা পাঠানো এবং টাকা পরিশোধের জন্য ‘.icu’ ডোমেইন ব্যবহার করা অত্যন্ত সন্দেহজনক। তার মতে, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের আন্তর্জাতিক নম্বর ব্যবহার করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই ওয়েবসাইটে যেকোনো গাড়ির নম্বর দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি ভুয়া মামলা তৈরি হয়। অভিযোগ হিসেবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই ‘গতিসীমা অতিক্রম’ দেখানো হয় এবং জরিমানা নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার টাকা। এরপর দ্রুত পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ের প্রলোভন দেখিয়ে বলা হয়—তিন দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করলে মামলা নিষ্পত্তি হবে মাত্র ১ হাজার ৫০০ টাকায়।
প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যবহারকারীর ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে দুটি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে ভয় এবং লোভ। একদিকে বলা হচ্ছে জরিমানা না দিলে জাতীয় চালক ডেটাবেজ ও ক্রেডিট রেকর্ডে প্রভাব পড়বে, অন্যদিকে দ্রুত পেমেন্টে ছাড় দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এটি দেখতে অনেকটাই বিএসপি বিআরটিএ’র মতো ডিজাইন করা। লোগো, রঙ ও ইন্টারফেস প্রায় একই ধরনের হওয়ায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে প্রকৃত ডোমেইনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
বাইরে থেকে ব্যবহারকারী একটি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিলেই সাইটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি মামলার বিবরণ তৈরি করে দেখায়। এরপর পেমেন্ট ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে কার্ডধারীর নাম, কার্ড নম্বর, মেয়াদের তারিখ ও সিভিভি নম্বর চাওয়া হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল হক বলেন, এই তথ্যগুলো কোনো প্রতারকের হাতে গেলে বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে ওই কার্ড ব্যবহার করে অননুমোদিত লেনদেন করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ফিশিং কৌশল, যেখানে সরকারি প্ল্যাটফর্মের অনুকরণ করে ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জন করা হয় এবং শেষ ধাপে আর্থিক তথ্য চুরি করা হয়।
ডোমেইন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতারণার সাইটটি গত ২৩ মে নিবন্ধিত হয়েছে। এটি নেইমসিলো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে এবং প্রাইভেসিগার্ডিয়ান সেবার মাধ্যমে মালিকের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রক্সি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সার্ভারের প্রকৃত অবস্থান আড়াল করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রতারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি বাস্তব সরকারি সিস্টেমের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়। ফলে অনেক ব্যবহারকারী যাচাই না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সরকারি সংস্থা কখনোই বিদেশি নম্বর বা অচেনা ডোমেইন ব্যবহার করে জরিমানার এসএমএস পাঠায় না। তাই অচেনা লিংকে প্রবেশ না করা, ডোমেইন নাম ভালোভাবে যাচাই করা এবং কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক কার্ড বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য প্রদান না করাই নিরাপদ।
Posted ৪:০৯ এএম | রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
ইউএসএ থেকে প্রকাশিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল | Mr. Reporter
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের আরও খবর
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।